শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বাংলাদেশ সচিবালয়। কিন্তু ইদানীং প্রায়শই সচিবালয়ের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা শ্রেণীর মানুষেরা আন্দোলনের কর্মসূচি পালন কিংবা দাবিদাওয়া আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে সচিবালয়কে জিম্মি করার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, ফ্যাসিবাদী শাসনে পদবঞ্চিত কমকর্তারা তাদের পদোন্নতির দাবিতে সচিবালয়ে নিয়মিতই জমায়েত হচ্ছেন। এছাড়াও সপ্তাহখানেক আগে, এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে একদল ছাত্রছাত্রী সচিবালয়ের ভেতরে ঢুকে বিক্ষোভ করেছেন। আর সর্বশেষ গত রোববার সচিবালয়ে যা ঘটলো তা নজিরবিহীন।

বেশ কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে আনসার বাহিনীর বিক্ষুব্ধ সদস্যরা এদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সচিবালয় ঘেরাও করে রেখেছিলেন। তাদের ঘেরাও কর্মসূচির কারণে কর্মদিবস শেষ হওয়ার পরও সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের অনেকেই অফিস থেকে বাসায় ফিরতে পারেননি। বরং একরকম জিম্মি অবস্থায় বন্দী ছিলেন। আনসার সদস্যরা বিগত সপ্তাহখানেক ধরেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রোববার পরিকল্পনামাফিক তারা সচিবালয়ের চারপাশে অবস্থান নেয়। 

তাদের সাথে সরকারের উপদেষ্টাসহ নানা কর্মকর্তার বৈঠক হয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী ছাত্রদের সাথেও তাদের বোঝাপড়া হয়। আনসারদের একটি গ্রুপ এসব সমঝোতায় সম্মত হলেও অন্য আরেকটি অংশ তাতে একমত না হয়ে আন্দোলন অব্যাহত রাখে। একটি পর্যায়ে সচিবালয়ের সামনেই ছাত্রছাত্রীদের সাথে আনসার বাহিনীর আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। বেশ কয়েকজন ছাত্র সমন্বয়কসহ শ’খানেক ছাত্র এবং বেশ কিছু আনসার এসব ঘটনায় আহত হন। পরবর্তীতে রাতের দিকে কয়েক হাজার ছাত্র সচিবালয়ের সামনে জড়ো হলে আনসাররা বাধ্য হয়েই সংযত হয়। সচিবালয়ের দেয়াল টপকে পালিয়ে যায় অনেকেই। আর বাকিরা সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় আত্মসমর্পণ করে।

এদিন সেনাবাহিনীর সদস্যদের সচিবালয়ের প্রধান গেইটসহ অন্যান্য স্থানে মোতায়েন করা হয়। একটি পর্যায়ে সেনাবাহিনী ও ছাত্রদের সাহসী ভূমিকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রশ্ন হলো, সচিবালয়ে বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে যে কেউ কেন এবং কীভাবে অবলীলায় প্রবেশ করতে পারছে? সচিবালয়ে ঢোকা কোনো সহজ বিষয় নয়। এখানে ইস্যুকৃত পাসের বিপরীতে একজন ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে হরহামেশাই কোনো একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ যদি সচিবালয়ের ভেতর চলে যেতে পারে তাহলে প্রশাসনের এই কেন্দ্রবিন্দুর অরক্ষিত অবস্থানই প্রমাণিত হয়।

সচিবালয় খুব স্পর্শকাতর স্থানে অবস্থিত। সচিবালয় থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। বিএনপি জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলেরও অফিস সচিবালয়ের আশপাশেই। তাই এসব স্থানে নিয়মিতভাবেই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালিত হয়। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলকে কখনোই এভাবে সচিবালয়ের দিকে ছুটে যেতে দেখা যায়নি। তাছাড়া সচিবালয়কে কেন্দ্র করে বরাবরই কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে রাখা হয়।

কিন্তু এইসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন কতটা কার্যকর- সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রশ্ন বারবার সামনে উঠে আসছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম আনসারের সাথে সংঘর্ষ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় গত রোববার বলেছিলেন, “আমরা ষোল বছরের একটি ফ্যাসিবাদী শাসনকে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছি। কিন্তু একদিনের জন্যেও আমরা সচিবালয় ঘেরাও করিনি বা এ ধরনের কোনো কর্মসূচিও দেইনি। দাবি পূরণের জন্য আমরা সচিবালয় অবরোধ করিনি। কারণ আমরা জানি, সচিবালয় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের প্রাণকেন্দ্র। সচিবালয় যদি কাজ করতে না পারে তাহলে আমাদের দাবি দাওয়া পূরণই বা কে করবে?”

তার এই কথাটি খুবই প্রণিধানযোগ্য। এভাবেই দূরদর্শিতার সাথে প্রতিটি মহলের কর্মসূচি ঘোষণা করা উচিত। আশা করি, যারা ভবিষ্যতেও কোনো দাবি দাওয়া তুলে ধরবেন, তারা সচিবালয়কে আর জিম্মি করবেন না। একইসাথে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত সচিবালয়ের নিরাপত্তা বলয় বৃদ্ধি করা। ইতোমধ্যেই ডিএমপির পক্ষ থেকে সচিবালয় ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের আশপাশে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আগামীতে সচিবালয়কে কেন্দ্র করে রোববারের মতো কোনো অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ